কিভাবে একটি কুরিয়ার ব্যবসা দার করাবেন?
পর্ব-০১

বাংলাদেশ এই মুহূর্তে চমৎকার একটি সময়ের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। নিত্য নতুন ইকমার্স কোম্পানি তৈরী হচ্ছে। মানুষজন এখন ঘরে বসেই সবকিছু পেতে চায়। বাড়ছে মানুষের ব্যস্ততা আর সেই ব্যস্ততার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘরে বসেই সব ধরণের পণ্য, পছন্দের খাবার, বাজার, পোষাক পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষের বাড়ছে। বিপুল এই চাহিদার যোগান দিতে যেমন প্রতিদিন গড়ে উঠছে অসংখ্য ইকমার্স সাইট, তেমনি গড়ে উঠছে হোম ডেলিভারি সার্ভিস কোম্পানিও। শহরে এখন ডানে বামে তাকালেই দেখা যায় কোন না কোন হোম ডেলিভারি কোম্পানির রাইডার। হয়তো কোন পণ্য নিয়ে বাইক হাঁকিয়ে যাচ্ছে কাস্টোমারের কাছে পৌঁছে দিবে বলে। সবাই ইকমার্স সেক্টরের মার্চেন্টদেরকে বাহবা দিলেও খুব কম মানুষই আছে যারা এই হোম ডেলিভারি সার্ভিস দেয়া কোম্পানিগুলোর প্রকৃত কষ্টটা বুঝে। সব দোষ সব সময় হোম ডেলিভারি কোম্পানিদের। যদিও এটা সত্য, মার্কেটটা নতুন হওয়ায় অনেকেই এখন এর বিভিন্ন সুযোগ নিচ্ছে। কিন্তু এখনের চেয়ে চমৎকার সময় বোধহয় আর হতে পারে না। আপনি যদি কুরিয়ার কোম্পানির পরিচালক হয়ে থাকেন কিংবা নতুন কুরিয়ার কোম্পানি খুলার পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে আমি আপনাকে বলবো, আপনি আপনার জীবনের সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্তের একটি নিয়েছেন। আপনি ভালোমতো ব্যবসা করলে আপনাকে মার্চেন্টরাই খুঁজে বের করবে। আপনার দরকার একটু ধৈর্য্য ধরে ব্যবসাটাকে একটু একটু করে বড় করা। তবে হ্যা এই বইটিতে কিছু গুরুত্বপূর্ন অংশের কথা বলা হয়েছে। এটি ভালোভাবে অনুসরণ করতে ভুলবেন না। প্রায় ৪ বছর হলো আমি ডেলিভারি কোম্পানিদের সাথে কাজ করছি। এই চার বছরে কম হলেও ৫০ টি ডেলিভারি কোম্পানি মার্কেট থেকে ঝড়ে পড়েছে। ইকমার্স ডেলিভারি সেক্টরটার বয়স বাংলাদেশে বেশী নয়। তাই পর্যাপ্ত পরিমাণ ডাটা কোথাও নেই। থাকলে হয়তো দেখা যেতো সংখ্যা টা আরও বেশী। ঠিক কি কি কারণে একটি কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে তা আমার নিজের চোখে দেখা। আবার অনেক কোম্পানি অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মার্কেটে টিকে থাকতে পেরেছে। কেন কিছু কোম্পানি টিকে থাকে আর কিছু কোম্পানি ঝরে পড়ে আর কিভাবেই বা একটি কোম্পানি অন্যদের চেয়ে আলাদা
হতে পারছে, সেই বিষয়টি আমাদের সকলের জানা দরকার। আর তা নিয়েই আমার এই লেখা।
এই লিখাটি কাদের জন্য ? - যারা মার্কেটে নতুন কুরিয়ার কোম্পানি খুলেছে বা খুলার পরিকল্পনা করছে। যারা মার্কেটে অনেকদিন কুরিয়ার ব্যবসা পরিচালনা করছে এবং ব্যবসাটাকে আরও এক ধাপ সামনে নিয়ে যেতে চায়। - যারা ডেলিভারি ব্যবসাটাকে আরও সহজভাবে অল্প লোক দিয়ে ভালভাবে পরিচালনা করতে চায়, অর্থাৎ এফিশিয়েন্সি (Efficiency) বাড়াতে চায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন - যারা কখনওই হাল ছাড়তে জানে না এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতে জানে।
এই লিখাটি কাদের জন্য নয় ? আপনার বন্ধু কুরিয়ার ব্যবসা করছে এবং বেশ ভালো করেছে, তা দেখে আপনিও কুরিয়ার কোম্পানি খুলার কথা ভাবছেন। আপনি ভাবছেন, এখন তো ইকমার্সের যুগ, সবাই এখন ডেলিভারি কোম্পানি খুঁজে। কাজেই আপনি মার্কেটে নেমে ১০০ টাকার ডেলিভারি ৪০ টাকায় অফার দিয়ে মার্চেন্ট এনে রাতারাতি অনেক বড় লাভজনক ব্যবসা করে ফেলবেন ভাবছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ - আপনি এই ব্যবসায় এসেছেন “শুধু টাকার” জন্য। ব্যবসায় মানুষ টাকা অবশ্যই উপার্জন করবে। কিন্তু তা যদি কেবল অর্থের জন্য হয়, তাহলে আপনার জন্য দুঃসংবাদ, আপনার জন্য কুরিয়ার ব্যবসা নয়, তেমনি এই বইটিও নয়। উপরের একটি লক্ষণও যদি আপনার সাথে মিলে, তাহলে আমার এই বইটি আপনার জন্য নয়। তারপরেও আপনি কারণগুলো বুঝতে চাইলে পরবর্তী লেখাগুলো পড়তে হবে নিজ দায়িত্বে।
ঠিক আছে, শুরু করা যাক তাহলে। সতর্কতাঃ এই বইয়ে আমি যা যা বলবো, তা আপনারা যদি একদম ভালোভাবে মেনে চলেন। আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন, আপনাদের এতো পরিমাণ ডেলিভারি অর্ডার আসবে যা দিয়ে আপনারা কুলিয়ে উঠতে পারবেন না।
সূচিপত্র
০১.ব্যবসা শুরুর প্রথম মাসে লাভ ১ টাকা
০২.মাসিক লাভ করতে হবে ১ লক্ষ টাকা
০৩.১টি প্রধান সমস্যা যা আপনাকে বহুগুণ লাভ করতে দেয় না।
০৪.একটি গুরুত্বপূর্ন সমস্যা যা সমাধান করলে ০৫.মার্চেন্টরাই আপনাকে খুঁজে নিবে।
০৬.কেন অন্য সবখানে ডিস্কাউন্ট কাজ ০৭.করলেও কুরিয়ার ব্যবসায় ডিস্কাউন্ট খুব ০৮.একটা কাজ করে না?
০৯.পার্টনার নির্বাচনে সতর্কতা
১০.বিশেষ ৩ টি হিসাব যা আপনাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে দেয়।
১১.কেন একটি ভালো কুরিয়ার ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার আপনার ব্যবসার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ন?
১২. কেন একটি ছোট জায়গা, যেখানে আপনার ব্যবসার অনেকখানি লাভ নির্ভর করে।
১৩.শেষ অধ্যায়ঃ কিভাবে এতো এতো অর্ডার পাবেন যা দিয়ে আপনি কুলিয়ে উঠতে পারবেন না?
ব্যবসা শুরুর প্রথম মাসে লাভ ১ টাকা
আমি অনেক কুরিয়ার কোম্পানিকে দেখেছি, লস দিয়ে ব্যবসা শুরু করতে। এক্ষেত্রে তাদের চিন্তা থাকে, “মাত্র তো শুরু করলাম, ধীরে ধীরে লাভ হবে”। এই ধারনাটা যখন মার্কেটে একদমই কোন ডেলিভারি কোম্পানি ছিল না, তখন প্রযোজ্য থাকলেও এখন বাস্তবতা ভিন্ন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, আপনি যদি লস দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন, আপনার লসেই সারাজীবন থাকার সম্ভাবনা বেশী। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন কেন? তার আগে আমি আপনাদেরকে বলছি, লস বলতে আমি কি বুঝিয়েছি। ধরা যাক আপনি নতুন কুরিয়ার কোম্পানি খুলেছেন। আপনার মার্চেন্ট সংখ্যা ৫ জন। আপনার দৈনিক ২০-৩০ টা ডেলিভারি অর্ডার আসে। আপনার এই ২০-৩০ টা অর্ডারে আপনার উপার্জন হয় দৈনিক ১,২০০ থেকে ১,৮০০ টাকা, যা মাসে এসে হয় ৩৬,০০০ টাকা থেকে ৫৪,০০০ টাকা।

যদি আপনার মাসিক উপার্জন ৫৪,০০০ টাকা হয়ে থাকে, সব কিছু ঠিক রেখে আপনার বেতন আপনি ১৬,০০০ টাকা নিয়ে থাকতে পারেন। লাভ ১ টাকা রাখতে পারেন।
এখন আসা যাক আগের প্রশ্নে, কেন প্রথম মাস থেকেই লাভ করতে হবে? কেন প্রথম মাসে লস করা যাবে না? করলে ক্ষতি কোথায়? অনেক কোম্পানিই তো প্রথম মাসে লস করেছে এবং পরবর্তীতে লাভ করেছে। এর উত্তরটা হচ্ছে, কোন ক্ষতি নেই। অন্তত আমার নেই। ক্ষতি হলে আপনার থাকতে পারে। আপনি ভাবছেন, আপনি ২-৩ মাস পরে লাভ করবেন যখন অর্ডার বাড়বে। এটি একটি মরীচিকা। আপনার যখন অর্ডার বাড়বে, তখন আপনার রাইডার বাড়বে। আপনার নাশতার খরচ, মোবাইল খরচ বাড়বে। আপনি কিভাবে মাত্র ৩৬ হাজার টাকায় লাভ করছেন, তা নির্ধারন করবে আপনি কিভাবে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকায়ও লাভ করতে পারবেন। যে ৩৬ হাজার টাকায় লাভ করতে পারে না, সে যদি ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকায় লাভ করে, সেটা অনেক কম হয়ে থাকে। ধরা যাক ২ বন্ধু একসাথে কুরিয়ার ব্যবসা শুরু করেছে। একজনের নাম রহিম আরেকজনের নাম করিম। রহিম এবং করিম ২ জনেই প্রথম মাসে ৩৬,০০০ টাকা উপার্জন করলেও রহিম প্রথম মাসে কোন লাভ করেনি, কিন্তু করিম করেছে ১ টাকা লাভ। ৩ মাস পরে ২ জনের উপার্জনই, ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা হয়েছে। এখন আপনি বলুন, আপনার কি ধারণা? কে বেশী লাভ করেছে? এটা বলে দেবার প্রয়োজন পরে না যে, করিম যদি ৫০,০০০ টাকা লাভ করে থাকে তাহলে রহিম করেছে মাত্র ১০-২০ হাজার টাকা লাভ। আর এই ব্যবধানই, একজনকে একদম সফল উদ্যোক্তা আরেকজনকে “কোনরকম ভালো” উদ্যোক্তা বানিয়ে দেয়। আমার এই লেখার উদ্দেশ্য আপনি কোনরকম ভালো থাকবেন এটা নয়। আমার এই লেখার উদ্দেশ্য আপনি চমৎকারভাবে ভালো থাকবেন। আপনি সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়বেন। আপনার লাভ নিয়ে চিন্তাও করা লাগবে না, কারণ আপনি প্রথম থেকেই একটি সিস্টেমে কাজ করে এসেছেন। কাজেই আবারো বলছি, ব্যবসা শুরুর প্রথম মাস থেকেই ১ টাকা হলেও লাভ করুন।
দ্বিতীয় পর্বে আমরা আলোচনা করব --------------০২.মাসিক লাভ করতে হবে ১ লক্ষ টাকা
0 মন্তব্যসমূহ